৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনার ভারত পালানোর ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন গতিপথ নির্ধারণ করে। ক্ষমতার ভাগাভাগি নেয়ার তাগিদে Sুষীল সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলো ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তবে এদিকে ছাত্র-জনতা নিজেদের জীবন বাজি রেখে রাজপথে ক্ষমতার রদবদলের জন্য লড়াই চালিয়ে যায়। দুর্ভাগ্যবশত, ছাত্র-জনতাকে পেছনে ফেলে ক্ষমতা বাড়ানোর লোভে রাজনৈতিক নেতা ও সুশীলরা একত্রিত হতে চান।
এই প্রেক্ষাপটে, আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কেন সংশ্লিষ্ট নেতৃত্ব সেদিন বঙ্গভবনে যাননি, এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক রিফাত রশিদ বিস্তারিত একটি পোস্ট দিয়েছেন।
তিনি তার ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেছেন যে, ‘মার্স টু ঢাকা’ কর্মসূচির পরিকল্পনা ছিল শহিদ মিনার বা শাহবাগ থেকে গণভবন অভিমুখী মার্স করা। তিনি আরও বলেছেন যে, যদি স্বরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ তাদের উপর আক্রমণ করে, তাহলে তারা ‘সশস্ত্র সংগ্রামের’ দিকে যাবেন। এই পরিস্থিতি ছাত্র-জনতার প্রতি বিপদের সংকেত দেয় এবং পরিস্থিতির বিপর্যয়ের চিহ্ন রাখে।
রিফাত রশিদের বক্তব্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরে, এবং এই জন্য প্রাসঙ্গিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রশ্নগুলো সামনে আনে। নাহিদ ভাই সশস্ত্র সংগ্রামের ঘোষণা নিয়ে একটি ভিডিও বার্তা তৈরি করেন এবং কিছু সাংবাদিকের কাছে পাঠিয়ে রাখেন। তাদের লক্ষ্য ছিল যদি পরবর্তীতে কেউ ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ না পান, তাহলে আন্দোলন কোনও নিস্তেজতায় না ভুগে সঠিকভাবে পরিচালিত হয়। সে সময় আন্দোলনের নেতৃত্ব যাঁরা দিচ্ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ভয় ছিল তাঁদের অনেকেই শহিদ হতে পারেন। রিফাত রশিদ উল্লেখ করেন, সকালে ঢাকার পরিস্থিতি ছিল উত্তেজনাকর। শহিদ মিনারের কাছে গুলি চলতে দেখা যায় এবং আসিফ, বাকের ও মোয়াজ্জেম ভাইদের হত্যার উদ্দেশ্যে চানখাঁরপুলে একটি বার্ন ইউনিটের ওপর থেকে স্নাইপার দিয়ে গুলি চলছিল। তবে কিছু সময় পরে, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে তাঁদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে আন্তঃসংযোগ বজায় রেখে গণভবন অভিমুখে চলে যায় জনতার প্রবাহ। লাখ লাখ মানুষের ঢল রাজধানীর রাস্তায় নেমে আসে। শাহবাগে অবস্থানের সময়, বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর আসতে থাকে যে হাসিনা পদত্যাগ করে সেনাবাহিনীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। আসিফ ভাই শাহবাগ থেকে ভিডিও বার্তায় জানান, সেনাশাসন দেশের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিফাত নিজেও ভিডিওবার্তা দেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ‘দেশের ভবিষ্যৎ ক্যান্টনমেন্ট থেকে নয়, অভ্যুত্থানের মঞ্চ শাহবাগ থেকেই নির্ধারিত হবে।’ এই বক্তব্য সারা দেশে জনগণের সমর্থন পেয়ে সেনাশাসনের সম্ভাবনা কার্যত অকার্যকর করে দেয়। এই ঘটনাগুলো পুরো পরিস্থিতি ও আন্দোলনের গতিপথকে নতুন করে মহিমা দেয় এবং আহত জনগণের সংগ্রামের ধারাকে প্রবাহিত করে।
শাহবাগ থেকে গণভবন অভিমুখে লং মার্চ শুরু হলো, কিন্তু আমরা তখনো জানতাম না হাসিনা আসলে পালিয়েছে কিনা। যখন লং মার্চ ফার্মগেটের কাছে পৌঁছায়, তখন খবর আসে যে হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে গেছে। সেই মুহূর্তেই গণভবনের দিকে এগিয়ে যাওয়া লং মার্চ বিজয় মিছিলে পরিণত হয়।
এই ঘটনার বর্ণনা দিতে চাই, কারণ যারা পুরো পরিস্থিতি জানেন না, তাঁদের জন্য বোঝা সহজ হবে। লং মার্চ শেষে আমাদের পরিকল্পনা ছিল দ্রুত শাহবাগে ফিরে যাওয়া, যেখানে আমরা ক্যাম্পাস খুলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করব যাতে বিপ্লবের পর বাংলাদেশ কিভাবে পরিচালিত হবে তা নির্ধারণ করা যায়। কিন্তু সময়টা এত সহজ নয় ছিল।
রিফাত তাঁর বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন, দুপরে আসিফ নজরুল স্যার নাহিদ ভাই, আসিফ ভাই ও মাহফুজ ভাইকে অনুসন্ধান করছিলেন আমাদের বঙ্গভবনে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তবে যারা দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রাথমিক বোঝাপড়া ছিল যে আমরা বঙ্গভবনে যাব না। আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল শাহবাগে জনতার মঞ্চ থেকেই যাবার। নাহিদ, আসিফ, মাহফুজ ভাইয়েরা এই সিদ্ধান্তে একমত ছিলেন। তবে ওই অবস্থায় সবাই একত্রিত হয়ে একটি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারার সুযোগ আমাদের ছিল না।
এটি আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল, যারা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তাঁদের মধ্যে সমন্বয় ও সক্রিয়তার গুরুত্ব বোঝা যাচ্ছিল।
আসিফ নজরুল স্যার নাহিদ, আসিফ এবং মাহফুজ ভাইদের রাজি করাতে ব্যর্থ হয়ে হাসনাত ভাইকে যোগাযোগ করেন। যারা আমাদের লং মার্চের ভিডিও দেখেছেন, তারা জানবেন যে নাহিদ ও আসিফ ভাই এক রিকশায় ছিলেন, আর সারজিস ও হাসনাত ভাই অন্য একটি রিকশায়। ফলে নাহিদ, আসিফ এবং মাহফুজ ভাইদের বঙ্গভবনে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি হাসনাত ভাইয়েরা জানতেন না।
রিফাত লিখেছেন, “আসিফ নজরুল স্যার হাসনাত ভাইকে ফোন করলে, তিনি স্যারের সঙ্গে গাড়িতে উঠে বঙ্গভবনের দিকে রওনা দেন, এই ভেবে যে আমরা সবাই সেখানে যাচ্ছি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন; সেখানে তখন দেশের সকল রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা ক্ষমতার ভাগাভাগির জন্য আগে থেকেই বসেছিলেন। যদি ছাত্র সমন্বয়কদের মধ্যে একটি গ্রুপকে সেখানে নিয়ে গিয়ে তাদের মাধ্যমে ম্যান্ডেট গ্রহণ করতে পারা যেত, তাহলে ক্ষমতা সেখানেই ভাগ হয়ে যেত।”
অর্থাৎ, সমাজের রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তনের প্রচেষ্টা শাহবাগ থেকে ক্যান্টনমেন্টের দিকে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ক্ষমতাকে রাজনৈতিক দলের সমর্থন নিয়ে বঙ্গভবনে স্থানান্তরিত করা হয়। এটি ছিল একটি বিপজ্জনক মুহূর্ত, যেখানে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্ত ও কার্যকলাপ অবমূল্যায়িত হচ্ছিল।
আমরা যখন টিভিতে দেখলাম হাসনাত ভাই বঙ্গভবনের দিকে যাচ্ছেন, তখন নাহিদ ভাই তাঁকে ফোন দিয়ে জানান যে, আমরা বঙ্গভবনে যাচ্ছি না। মুহূর্তের মধ্যে হাসনাত ভাই গাড়ি থেকে নেমে আমাদের কাছে ফিরে আসেন। তখন আমরা চ্যানেল ২৪-এর অফিসে প্রেস ব্রিফিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সেখান থেকেই আমরা ঘোষণা করলাম যে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে একটি গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছে, এবং শিক্ষার্থীরাই এ দেশের পরবর্তী ক্ষমতা কাঠামো নির্ধারণ করবে। এর ফলে একটি বার্গেনিং পয়েন্ট তৈরি হয়। এই পয়েন্টের শক্তি এবং দেশের জনগণের সমর্থনের ফলে আমাদের পরবর্তী ক্ষমতা কাঠামো থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি।
রিফাত লিখেছেন, "তবুও নানা কৌশল ও পরিকল্পনা চলছিল আমাদের বিরুদ্ধে। এর ফলে, রাতে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে নাহিদ ভাই, আসিফ ভাই, এবং বাকের ভাই জানান যে, ড. ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত করা হবে, যা দেশের সর্বস্তরের জনগণের সমর্থন পাবে। মূলত, ছাত্র প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টাকে সর্বসম্মতিক্রমে নিয়োগের মাধ্যমে সরকারের মধ্যে ছাত্রদের অংশীদারি নিশ্চিত করা যায়।"
পোস্টের শেষাংশে রিফাত বলেছেন, "যারা মনে করেন যে ছাত্ররাই দেশ চালায়, তারা ভুলভাবেন। ছাত্ররা গোটা ক্ষমতার কাঠামোর একটি অংশ—সেখানে মোটেও পুরোপুরি ছাত্ররা নেই। সরকারের সঙ্গে ছাত্র প্রতিনিধিদের অবস্থান নিয়ে ভাবে বার্গেইন করতে হতে হয়। সরকারের বাইরের ছাত্রদের ভরসা হয় রাজপথ, তাঁদের ভরসা শিক্ষার্থীরা এবং জনগণ। এর বাইরে তাঁদের কোনো ভরসার জায়গা নেই।"

0 মন্তব্যসমূহ